টুনটুনি - সে বাস্তব নাকি কল্পনা?
টুনটুনি - সে বাস্তব নাকি কল্পনা?
পশ্চিম আকাশ রাঙা হয়ে এলো। পাখিরা ফিরে যাচ্ছে তাদের নীড়ে।
অমল বসে আছে নদীর পাড়ে। চেয়ে রয়েছে ঐ রাঙা দিগন্তের দিকে। ও ভাবুক প্রকৃতির। একটু আধটু লেখালেখিও করে। ধীরে ধীরে রাত হয়ে এলো। তবুও সে উঠলো না। হঠাৎ একটা হাত তার পিঠের পড়ে পড়তেই সে লাফিয়ে উঠল। খানিকটা চিৎকার করেই বলল,"কে?"
পিছনে তাকিয়ে দেখে একটি ছোট্ট মেয়ে। বয়স তার নয় কি দশ হবে তার বেশি নয়। সে হাসতে হাসতে বলল, "এতো বড়ো হয়েছে তাও ভয় পায়।" আবার হাসতে থাকল।
অমল কিছুক্ষণ পর বলল, "এমন করলে তো সবাই ভয় পায়। কিন্তু তুমি কে?"
"আগে বলো তুমি কে? আগে তো কোনোদিন দেখিনি তোমাকে । আচ্ছা তোমাকে তুমি করে বললে কোনো সমস্যা?"
"বলে ফেলেছো যখন তখন আর কি করার তুমি করেই বলো।"
"তা তুমি কে এখনো বললে না তো।"
"আমি এই গ্রামে কালকে এসেছি। আমার নাম... না থাক বলব না।"
ছোট্ট মেয়েটি মুখ ভেঙচিয়ে বলল, "কোথাকার কোন সাহেব এলেন রে নাম বলবে না।"
"তুমিও তো তোমার পরিচয় দেওনি। তাহলে আমি বলব কেন?"
"আমি টুনটুনি গো টুনটুনি।"
"ও তুমি টুনটুনি।"
"হ্যাঁ। আচ্ছা তুমি এতো রাতে এখানে কেন? এখানে তো রাতে কেউ থাকে না।"
"কেন? কেন থাকে না।"
"কি করে জানবো। তারাই জানে তারা কেন থাকে না।"
"তুমি এতো ছোটো হয়ে এতো রাতে এখানে। তোমার ভয় করে না?"
মেয়েটি আবার হাসল। অমল আবার বলল," হাসছো কেন?"
মেয়েটি বলল, " আমার বাড়ি তো এখানেই।"
"মানে?"
"মানে এই পাশেই।"
"তা এখানে আসে পাশে তো কোনো ঘর দেখলাম না। "
"তুমি তো দেখছি চোখেও দেখতে পাও না। এই পাশেই আমার বাড়ি। তুমি তো এই গ্রামে নতুন এতোকিছু কিভাবে জানবা।"
"সেটাও ঠিক। তো টুনটুনি এই যে তুমি একজন অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলছো তোমার তো দেখছি কোনোকিছুতেই ভয় নেই!"
" আমি কি তোমার মতো ভীতু নাকি।" বলে টুনটুনি হাসল।
"আচ্ছা টুনটুনি তোমার বাবা কি করেন? তোমার বাবা মায়ের নাম কি? "
"আমার বাবার নাম.... বলবো না।" বলে আবার জোরে হেসে উঠলো।
"তুমি তো দেখছি ভারি দুষ্টু।"
"তাতে তোমার কি ভীতু ছেলে। আচ্ছা অনেক রাত হলো এবার তুমি যাও।"
"তুমি কি করবে, টুনটুনি?"
টুনটুনি হেসে বলল, "আমি যা ইচ্ছা তাই করব। তোমাকে বলতে হবে নাকি। এক্ষুনি যাও এখান থেকে।"
অমল এবার ওর কথা শুনে চলে গেল। অনেক দূর গিয়ে নদীর ঘাটের দিকে তাকিয়ে দেখল ও নেই। অমল ভাবলো হয়তো ও বাড়ি চলে গেছে। অমল বন্ধুর বাড়ি ফিরলো। ওর বন্ধুর নাম শুভ। শুভ সবসময় কথা বলতেই থাকে। বাঁচাল প্রকৃতির। তারা দু'জন দু'জনের বিপরীত। শুভ অমলকে বলল,"কোথায় ছিলি এতক্ষণ? চিন্তায় পড়ে গেছিলাম।"
অমল বলল,"ঐ নদীর পাড়ে ছিলাম।"
"বাবা অমল তোর কত সাহস রে। এতো রাতে তো ওখানে কেউ যাওয়ার ও সাহস করে না। আর তুই ওখানে বসে ছিলি। কি করছিলি অন্ধকারে বসে?"
"তেমন কিছু না।"
"ভুতের সাথে গল্প করছিলি নাকি?" বলে শুভ হেসে উঠলো।
"আরে ভুত হবে কেন একটা ছোট্ট মেয়ের সাথে গল্প করছিলাম।"
"কী? কোন মেয়ে? কোন বাড়ির মেয়ে? এতো রাতে ওখানে কি করছিলো?"
"আরে! থাম থাম। এতো প্রশ্নের উত্তর একবারে কিভাবে দিবো?"
"বলতো কোথায় ঐ মেয়ের বাড়ি?"
"বলল তো ঐ নদীর পাশেই।"
"কি! বলিস কি!"
"ঐ নদীর আশেপাশে তো কোনো বাড়িই নেই।"
"তাহলে আমার সাথে মজা করেছে হয়তো।" বলে অমল হাসলো বটে কিন্তু অমলের কিছু একটা সন্দেহ হলো।
শুভ বলল,"তা হতে পারে। মেয়েটা নাম কি?"
"কি যেন বলল... ও হ্যা টুনটুনি।"
"টুনটুনি নামে কোনো মেয়ে তো এ গ্রামে আছে বলে আমার জানা নেই।"
অমল বলল, "বাদ দে তো..."
তারপর অমল বিভিন্ন কথা বলে বিষয়টা চাপা দিল। কিন্তু অমল নিজে চিন্তামুক্ত হতে পারলো না।
দুইদিন পর অমল শহরে ফিরল। তবে টুনটুনিকে গত দু'দিন আর কোথাও ও দেখেনি। এমন কি রাতে নদীর পাড়েও না। আজ অমল টুনটুনির মতোই এক মেয়ে দেখল সে। মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এভাবে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঐ মেয়েকে দেখতে পায়। অমল ভূত প্রেতে কোনোদিনই বিশ্বাসী না। তাই অমল ওর এক বন্ধুর কাছে গেল। ওর বন্ধু একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। তার কাছে সব খুলে বলার পর ওর বন্ধু অনেক ভেবে তারপর বলল, "হয়তো এটা তোর হ্যালুসিনেশন হতে পারে। তুই কি এমন কোনো মেয়ে সম্পর্কে কিছু ভাবছিলি ঐদিন ঐ নদীর পাড়ে। "
"আমি অনেক দিন যাবৎ একটা গল্প লিখতে চাচ্ছিলাম যদিও এখনো ওটা লিখে ওঠা হয়নি। তার মেইন চরিত্র একটি ছোট্ট মেয়ের।"
"দেখ, অমল, আমার মনে হয় তুই গল্পটা নিয়ে এতটাই ভেবেছিস যে তোর নিজের মনই তোর একটা জন্য একটা চরিত্রের সৃষ্টি করেছে আসলে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুই ঐ মেয়েকে বাস্তব ভাবছিস কিন্তু ও তোর কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। তুই তোর গল্পটা লিখে ফেল। দেখ তারপর কি হয়।"
অমল ওর বন্ধুর কথা মতো গল্পটি লিখে শেষ করে। আর ওর গল্পের প্রধান চরিত্রের নাম দেয় ঐ সেই মেয়েটির নামে। গল্পটি লেখার পর থেকে ও আর কোনোদিন মেয়েটিকে দেখতে পাই নি...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন