রহস্যের স্বপ্ন
রহস্যের স্বপ্ন
- অ্যাড্রয়েট রহস্য
কে? কে ওখানে?
হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে রহস্য বেশ ভয় পেয়ে গেল। সে বুঝতে পারলো না সে কি স্বপ্ন দেখেছে নাকি সত্যি ওখানে কেউ ছিল।
রহস্য উঠে বসলো। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত তিনটা বাজে সে আর সহ্য করতে পারছে না বিষয়টা। প্রতিদিন একই ঘটনা কেউই মেনে নিতে পারে না। গত তিনদিন যাবৎ প্রতিদিনই রাত তিনটায় একটা স্বপ্ন দেখে ওর ঘুম ভেঙে যায়। যদিও এ সম্পূর্ণ কাকতালীয় হতে পারে। তবুও রহস্যের বিষয়টা নিয়ে সন্দেহ লাগছে।
আজ তার আর ঘুম আসলো না। সারা রাত না ঘুমিয়ে সকালে তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু করে। তাই বেলা ১০ টা বাজলেও সে বিছানা থেকে উঠতে পারেনি।
ঠক... ঠক... ঠক...
দরজার কেউ নক করলো।
রহস্য উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো দীপ্ত এসেছে। দীপ্ত বলল, "এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিস কেন?"
রহস্য বলল, আর বলিস না প্রতিদিন রাতে যা শুরু হইছে। আর পারা যাচ্ছে না।"
দীপ্ত হেসে বলল, "কেন তোর প্রেমিকা কি রাতে ফোনে কথা বলিয়ে বলিয়ে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে নাকি?"
" আরে ধুর! তোকে আর কতবার বলব আমার কোনো প্রেমিকাই নাই।"
"তাহলে বউ আছে?"
"এইবার কিন্তু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।"
"তাহলে কম কম বলি?"
"যা দূর হো এখন! ভালো লাগছে না।"
"সত্য কথা মানুষের গায়ে লাগে।"
"দীপ্ত, ভাই তোর পায়ে পড়ি! এইবার থাম।"
"আচ্ছা, থামলাম। এইবার বল কি হলো রাতে?"
"আরে প্রতিদিন রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে যায় এক অদ্ভুত স্বপ্নে। আর অবাক করার বিষয় হলো রাত তিনটাতেই এক মিনিট আগেও না এক মিনিট পরেও না।
দীপ্ত বলল,"কি স্বপ্ন দেখিস?"
"আরে দীপ্ত তেমন কিছু না তবে..."
"তবে আবার কি? তুই আগে বল কি দেখিস!"
"আমি দেখি আমি শুয়ে আছি এমন সময় একটা মেয়ে আমার সামনে আসে। কিন্তু অন্ধকারে তাকে ঠিক মতো দেখতে পাইনি। তারপর আমি 'কে? কে?' বলে উঠলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।"
দীপ্ত হেসে বলল," দেখছিস বউদি তোর স্বপ্নে এসে তোর ঘুম হারাম করে দিচ্ছে।"
এবার রহস্য রেগে গিয়ে দীপ্তর পিঠে ধুম করে একটা কিল বসিয়ে দিল।
দীপ্ত বলল,"ওই! মারলি কেন?"
"আমি মরছি আমার জ্বালায় আর তুই মসকরা করছিস।"
রহস্য মনমরা হয়ে বসে থাকলো। দীপ্ত বলল,"আচ্ছা একটু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে আয়।"
রহস্য দশ মিনিট পর জামা কাপড় চেঞ্জ করে আসলো এবং দীপ্তকে বলল, "চল একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি।"
"এই রোদে বাইরে যাবি কি করতে?"
"আরে একটু বাজার করতে হবে।"
"ওহ, আচ্ছা চল।"
"তোর সেই ছাত্রের কি অবস্থা। তুই তো এই টাইমে ওকে পড়াতে যাস। যাসনি আজকে?"
"না, আজকে নাকি ওর জ্বর এসেছে।"
বাজারে হঠাৎ সার্থকের সাথে দেখা। এরা সবাই স্কুলজীবন থেকে বন্ধু। সার্থক বলল,"আরে দুইজনই আছিস দেখছি।"
দীপ্ত বলল, "আসলাম একটু রহস্যের সাথে।"
"রহস্য,তোর এমন ভূতের মত চোখ লাল কেন? আজকাল নেশা করা শুরু করলি নাকি?"
দীপ্ত বলল, "হ্যাঁ, আজকাল নেশাখোর হয়ে গেছে।"
রহস্য হেসে বলল,"হ্যাঁ রে ভাই, সে ভয়ঙ্কর নেশা।"
সার্থক বলল,"কি হয়েছে বলতো।"
"চল আগে বাজার করেনি। তারপর বলছি।"
"আচ্ছা, চল।"
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। দীপ্ত বলল, "দাঁড়া দেখেনি আবার কে কল দিচ্ছে।" দীপ্ত ফোনে কথা বলতে লাগলো।
সার্থক বলল,"বল না কি হয়েছে?"
রহস্য বলল,"আরে এক স্বপ্ন..."
সার্থক বলল,"কি স্বপ্ন?"
রহস্য স্বার্থকে সবটুকু খুলে বলল।
সার্থক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,"আরেকদিন দেখ স্বপ্ন দেখিস কিনা।"
রহস্য চুপ করে রইলো।
হঠাৎ দীপ্ত বলল, "আমাকে একটু যেতে হবে। তোরা থাক।"
"কি হলো? তোকে এমন জরুরি তলব করল কে?"
দীপ্ত চলে যেতে যেতে বলল,"এসে বলবা নে।"
স্বার্থক আর রহস্য বাজার করতে লাগলো। রহস্য বাজার করে বাসায় আসার পথে হঠাৎ-ই ওর বান্ধবী হেমার সাথে দেখা। বহুদিন যাবৎ সামনাসামনি দেখা হয় না ওদের।
হেমা বলল, "আরে রহস্য, কেমন আছিস?"
রহস্য প্রথমে খেয়াল করেনি। পরে বলল, "আরে হেমা যে। আছি ভালোই তোর কি খবর?"
হেমা বলল," এইতো ভালোই।"
রহস্য বলল," শুনলাম তুই নাকি ডাক্তার হয়ে গেছিস।"
হেমা বলল," আর... তবে ওই একটু-আধটু।"
"ডাক্তার আবার একটু-আধটু কি করে হয় রে?"
"হয়... হয়... এতদিন পর দেখা তা কি তুই শুধু তর্কই করবি?"
"আরে না!"
হেমা বলল," চেহারার কি অবস্থা করেছিস।"
"আচ্ছা, ডাক্তার ম্যাডাম বলেন তো আমার আসলে হয়েছেটা কি?"
"তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে ঘুম টুম তো পরিস না ঠিকমত।"
"হুম। ঘুমটুম পড়া হচ্ছে না।"
" কেন রে? ঘুম কোথায় গেল? নাকি বউদি ঘুম পড়তে দিচ্ছে না?"
"একখান প্রেমিকাই জুটলো না কোনোদিন বউদি তো দূরে থাক।"
তারপর রহস্য সবকিছু খুলে বলল। হেমা বলল,"তুই কি অনেক বেশি স্ট্রেসে থাকিস নাকি?"
"না।"
"তবে..."
হঠাৎ হেমা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,"ইসস... দেরি হয়ে গেল। আমি আর দাড়াতে পারবো না। এক জায়গায় যেতে হবে।"
"আচ্ছা, যা"
"তোর বাসা কোথায়?"
"আমার বাসা এই গলির ভিতরেই লাল রং করা একটা তিন তলা বাড়ি আমি নীচ তলায় থাকি। বাড়ির নাম 'আশ্রয়'।"
"তোর ফোন নাম্বারটা দে তো হারায়ে ফেলছি।"
ফোন নাম্বারটা নিয়ে হেমা চলে গেল।
রহস্য বাড়ি এসে কোনোরকমে একটু রান্না কর খেয়ে শুয়ে পড়লো। সারারাত ঘুম হয়নি তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো।
বিকাল চারটা কি পাঁচটা বাজে। দরজার কেউ নক করলো। রহস্য থতমত খেয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়লো। দেখলো দীপ্ত দাঁড়িয়ে।
"ওহ! তুই।"
"কেন অন্য কারো অপেক্ষায় ছিলি?"
"আরে না! ঘুমিয়ে ছিলাম।"
"এখন ঘুমাচ্ছিলি।"
"হয়...বাজার থেকে এসে খেয়ে ঘুমায়ে পড়ছিলাম। তুই তখন চলে গেলি যে?"
"আরে ও কল দিছিলো!"
"বুঝলাম..."
"আচ্ছা, দুপুরে তো খাসনি মনে হয়।"
"হুম, খাইনি।"
"আচ্ছা খেয়েনে ৩০ মিনিটের মধ্যে। বাইরে ঘুরতে যাবো একটু চল।"
"আচ্ছা।"
দীপ্ত আবার চলে গেল।
রহস্য খেয়ে রেডি হয়ে বসে আছে। কিন্তু ৩০ মিনিট বলে ৪০ মিনিট হওয়ার পরেও দীপ্ত দেখা নেই।কিছুক্ষণ পর দীপ্ত এসে বলল,"বাহ! তুই তে রেডি হয়েই আছিস।"
"তুই কবে টাইমে আসবি?"
দীপ্ত হেসে বলল, "বাইরে রোদ ছিল তাই আর কি।"
"কেন? রোদে কি তোর চামড়া পুড়ে যাবে নাকি?"
রহস্য আর দীপ্ত বাইরে গেল। কিন্তু রহস্য নিজের মোবাইলটা ভুল করে ঘরে রেখে চলে গেছে।
বাইরে থেকে ফিরে আসার পর দেখে ফোনে ১০ বার কেউ কল দিছে। তাড়াতাড়ি ফোন উঠিয়ে দেখে অচেনা নাম্বার। ফোনে টাকা না থাকায় কলব্যাক করতে পারেনি।
রাত ৮ টা বাজে একটু টিভি দেখে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো। কালকে শনিবার। ৮ টায় এক ক্লাস টেনের ছাত্রকে পড়াতে যেতে হবে। ঘুমানোর পর রহস্য স্বপ্ন দেখল আজও সেই মেয়ে তার সামনে। সে আজকে আর 'কে?' বলে চেঁচিয়ে ওঠেনি। সে ঘুমিয়ে থাকার ভান করলো। সে দেখলো মেয়েটা হাঁটতে হাঁটতে ওর কাছে এসে বলছে,"রহস্য। রহস্য।" রহস্য উঠে বসে দেখলো। মেয়েটা দেখতে ভারি সুন্দর। পরনে নীল শাড়ি। রহস্য বলেই বসলো,"তুমি কে?"
মেয়েটি হেসে বলল,"হায়রে কপাল! নিজের বউকে বলে 'তুমি কে?' "
মেয়েটির কথা শুনে রহস্য তো অবাক। রহস্য এবার কনফিউজড হয়ে গেল। সে বাস্তবে আছে নাকি স্বপ্নে। ওর কাছে সব কিছু বাস্তব-ই মনে হলো। রহস্য বলল,"এখন কয়টা বাজে?"
"সাতটা বাজে।"
"কি!"
"হ্যাঁ, সাতটা বেজে গেছে। তাড়াতাড়ি ওঠো। তুমি দশটার দিকে হসপিটালে যাবে তো।"
"কেন?"
"তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?"
"কেন?"
"তুমি তো ডাক্তার। রোগী দেখতে যাবে না?"
রহস্য পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর যা ঘটছে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে লাগলো। রহস্য এটা দেখেও অবাক হলো যে তার নিজের একটা বাড়িও আছে। গাড়িও আছে। এবার খেয়ে দেয়ে গাড়িতে করে হসপিটালের দিকে রওনা দিল। বিপত্তিটা ঘটলো এইবার। হঠাৎ একটা ট্রাক ওর গাড়ির সামনে চলে এলো। ট্রাকটার সাথে ওর গাড়িটার এক বিরাট দুর্ঘটনা ঘটতে যাবে ঠিক তখনই রহস্য লাফিয়ে উঠলো। রহস্য প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছে না। ও দেখল ও মশারির মধ্যে শুয়ে ছিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিজেকে সামলে নেওয়ার পর দেখল ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। রহস্য এইবার বুঝতে পারলো এতক্ষণ সে ঘুমের মাঝেই এতকিছু দেখছিল। আসলে ও এখনো দশম শ্রেণিতেই পড়ে। রহস্য হেসে নিজেকে বলল, "রহস্য, বাহ! তুই স্বপ্নের ভিতরেও স্বপ্ন দেখিস!"
"আরেকটু ঘুমিয়ে নিই," বলে রহস্য আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
না জানি এবার আবার কি স্বপ্ন দেখবে...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন